৪১টি ধারা সংশোধনের প্রস্তাবসহ শ্রম আইন ২০১৮ মন্ত্রিসভায় অনুমোদন
বাংলাদেশ
শ্রম (সংশোধন) আইন ২০১৮-এ নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। আইএলও কনভেনশন
অনুযায়ী বর্তমান বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-কে আরও যুগোপযোগী করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন
মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম।
সোমবার
(৩ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে সংশোধিত আইনের খসড়ায় অনুমোদন দেওয়া
হয়। বৈঠক শেষে সচিব জানান, শ্রম আইন ২০০৬ সংশোধন করা হয়েছিল ২০১৩ সালে। তখন এই
আইনের ৯০টি ধারা সংশোধন করা হয়েছিল। এখন ২০১৮ সালে সংশোধনের মাধ্যমে এটিকে আরও
যুগোপযোগী এবং শ্রমবান্ধব করা হয়েছে।
শফিউল
আলম বলেন, ‘শ্রম আইনে ধারা হচ্ছে ৩৫৪টি। এই সংশোধনী প্রস্তাবে দুটি ধারা, চারটি
উপধারা, আটটি দফা সংযোজন করা হয়েছে। ৬টি উপধারা বিলুপ্ত করা হয়েছে। ৪১টি ধারা
সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে।’ জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনেই এই আইন পাস করা হতে
পারে বলেও জানান সচিব।
তিনি
জানান, ‘এই আইনের উল্লেখযোগ্য সংশোধনের প্রস্তাবগুলো হলো কোনও কারখানায় কর্মরত
শ্রমিকদের ২০ শতাংশের সম্মতিতে ট্রেড ইউনিয়ন করা যাবে। এর আগে ৩০ শতাংশ লাগতো। ১৪
বছর বয়সের নিচে কোনও শিশুকে কোনও কারখানায় নিয়োগ দেওয়া যাবে না। ১৪ বছরের নিচে
কাউকে নিয়োগ দেওয়া হলে মালিকের ৫ হাজার টাকা জরিমারা হবে। ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী
কিশোরদের কারখানায় শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে। কারখানায় নারী শ্রমিকরা ৮
সপ্তাহের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি পাবেন। এর ব্যত্যয় হলে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা
দিতে হবে। কোনও নারী শ্রমিক সন্তানসম্ভবা হলে তার প্রমাণ পেশ করার ৩ দিনের মধ্যে
ছুটি দিতে হবে। ৫১ শতাংশ শ্রমিকের অনুমতি সাপেক্ষে ধর্মঘট করা যাবে। যেকোনও শ্রম
আদালতে ৯০ দিনের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে হবে। না হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে
অবশ্যই করতে হবে। এই ১৮০ দিনের মধ্যেও যদি নিষ্পত্তি না হয় তাহলে বাকি পরবর্তী ৬০
দিনের মধ্যে আপিল করতে পারবে।’
তিনি
আরও জানান, ‘কর্মক্ষেত্রে কর্মরত অবস্থায় কোনও শ্রমিক মারা গেলে দুই লাখ টাকা এবং
দুর্ঘটনায় স্থায়ীভাবে পঙ্গু হলে আড়াই লাখ টাকা শ্রমিককে দিতে হবে। আর কোনও শ্রমিক
সংগঠন বিদেশ থেকে চাঁদা আনলে তা সরকারকে অবহিত করতে হবে। শ্রমিক সংগঠনের
রেজিস্ট্রেশন ৬০ দিনের পরিবর্তে ৫৫ দিনের মধ্যে করতে হবে। শ্রমিকদের কল্যাণে
যেকোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সরকার, মালিক ও শ্রমিক এই ত্রিপক্ষীয় পরিষদ করার
বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।’
২) শ্রম (সংশোধন) আইন-২০১৮ : এবার
শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হবে তো?
শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন)
আইন-২০১৮-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এতে কারখানা-শিল্প
প্রতিষ্ঠানের মালিক ও শ্রমিকদের বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি কমিয়ে আনা হয়েছে।
শিল্পক্ষেত্রে সুস্থ অবস্থা তৈরির জন্য ও শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য
শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও উন্নত
জীবনমানের নিশ্চয়তায় শ্রমবান্ধব আইনের বিকল্প নেই।
জানা গেছে, শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা ও
উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য ২০০৬ সালে প্রথম শ্রম আইন করা হয়েছিল। ২০১৩ সালে এর অনেক
বড় সংশোধন হয়। প্রস্তাবিত আইনে মালিক ও শ্রমিকদের অসদাচরণ বা বিধান লঙ্ঘনের জন্য
শাস্তি সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড। আগে
শাস্তি ছিল ২ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড। প্রস্তাবিত
আইনে মালিক ও শ্রমিকদের বিভিন্ন অসদাচরণের বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে। বল প্রয়োগ,
হুমকি প্রদর্শন, কোন স্থানে আটক বা উচ্ছেদ শারীরিক আঘাত এবং পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস
সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে অথবা অন্য কোনো পন্থা অবলম্বন করে মালিককে নিষ্পত্তিনামায়
দস্তখত করতে বা কোনো দাবি গ্রহণ বা মেনে নিতে বাধ্য করতে চেষ্টা করতে পারবেন না
শ্রমিকরা। করলে এটা অসদাচরণ হবে। প্রতিবন্ধী শ্রমিককে বিপজ্জনক যন্ত্রপাতির কাজে
বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ করা যাবে না। আগে এ ক্ষেত্রে শর্ত সাপেক্ষে শিশু
শ্রমিককে বিপজ্জনক কাজে নিয়োগ করার বিধান ছিল। অপ্রাপ্তবয়স্ক শব্দটি শ্রম আইন থেকে
বাদ দিয়ে সেখানে কিশোর শব্দটি যোগ করা হয়েছে। আগে ১২ বছর বয়সী শিশুরা কারখানায়
হালকা কাজের সুযোগ পেত। সংশোধিত আইন অনুযায়ী ১৪-১৮ বছর বয়সী কিশোররা হালকা কাজ
করতে পারবে। কোনো ব্যক্তি কোনো শিশু বা কিশোরকে চাকরিতে নিযুক্ত করলে পাঁচ হাজার
টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন বলেও আইনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত আইন
অনুযায়ী, শ্রমিকরা কর্মরত অবস্থায় মারা গেলে এক লাখ টাকার বদলে দুই লাখ টাকা এবং
স্থায়ীভাবে অক্ষম হলে সোয়া এক লাখ টাকার পরিবর্তে আড়াই লাখ টাকা পাবেন। সংশোধিত
আইনে প্রস্তাবিত বিষয়গুলো প্রাসঙ্গিক। কার্যকারিতা এখন দেখার বিষয়। আমাদের দেশে
শ্রমিকের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত নয়, নানা ক্ষেত্রে নানাভাবে উপেক্ষিত। কর্মক্ষেত্রে
শ্রমিকরা নিরাপত্তাহীন ও ন্যায্য মজুরি-বঞ্চিত হয়ে আসছেন। সুস্থ শিল্প বিকাশের
স্বার্থে শ্রমিকের মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংশোধিত শ্রম আইন-২০১৮
যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে শ্রমিকদের অধিকার সংরক্ষণ ও
সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ব্যাপারে রাষ্ট্রকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।
প্রস্তাবিত আইনে শিশুশ্রমকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শিশুশ্রম বন্ধে সরকারের পাশাপাশি
সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে পালন করতে হবে ইতিবাচক ভূমিকা। তবেই দেশের শিশুরা
ভবিষ্যতে মানবসম্পদ তথা জাতির প্রকৃত কর্ণধার হয়ে উঠবে।
শিশু শ্রম কি? শিশু অধিকার
সনদে মূলনীতি কি?
শিশু এবং কিশোর/কিশোরী
জাতিসংঘ
শিশু অধিকার সনদ এবং বাংলাদেশের সংবিধানে অনুযায়ী আঠারো (১৮) বছরের কম বয়সী
সকল
বাংলাদেশী ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে এবং চৌদ্দ (১৪) থেকে আঠারো (১৮) বছরের কম বয়সী
শিশুদেরকে
কিশোর/কিশোরী হিসেবে গন্য করা হয়। স্কুল চলাকালীন সময় চৌদ্দ (১৪) বছরের নিচে কোন
শিশুকে তার পরিবারের লিখিত অনুমতি ছাড়া উৎপাদনশীল কাজে নিয়োগ দেয়া বা কাজ করিয়ে
উৎপাদন
কাজে এবং পরোক্ষভাবে গার্হস্থ্য শ্রমে ব্যয় করাকে বোঝায়। ১২ই জুন বিশ্ব শিশু শ্রম
প্রতিরোধ
দিবস
হিসেবে পালন করা হয়।
শিশু শ্রম নিরসনে
গার্মেন্টস মালিকের করণীয়:
গার্মেন্টস শিল্প থেকে পর্যায়ক্রমে শিশুদের
প্রত্যাহার করা
শিশুদের জন্য বিশেষ বিদ্যালয় স্থাপন করা
শিশুদের পরিবারের প্রাপ্তবয়ষ্ক সদস্যদের কাজে
লাগানো
শিশুদের বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থা করা
বিশেষ তত্ত্বাবধান, নির্দেশনা এবং সতর্কমূলক
ব্যবস্থা গ্রহন করা
শিশু অধিকার সনদে মূলনীতি:
বৈষম্যহীনতা
শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষা
শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষা
শিশুর অধিকার সমুন্নত রাখতে পিতা মাতার দায়িত্ব
শিশুদের মতামতের প্রতি
সম্মান প্রদর্শন
বাংলাদেশে শিশু শ্রম:
যে বয়সে শিশুর হাতে থাকার কথা ছিল বই আর
পেন্সিল কিন্তু তার পরিবর্তে শিশুটি নিজের আহার জোগানোর জন্য কাজের সন্ধানে নামতে
বাধ্য হচ্ছে। এক শ্রেণীর লোভী স্বার্থ পিপাসু মানুষ এই সকল শিশুর দারিদ্রের
দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ওদের দ্বারা কাজ করায়। কেননা এ সকল শিশুদের শ্রমের মূল্য
খুবই নগন্য। বাংলাদেশে যে সকল সেক্টরে শিশু শ্রমের প্রবনতা বেশি তার মধ্যে
টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস, প্রিন্ট এবং এমব্রয়ডারি, পোশাক, চামড়া শিল্প, জুতা এবং ইট
কারখানা অন্যতম। এখনো বয়ষ গোপন করে অনেক শিশু গার্মেন্টসে কাজ করছে। মার্কিন শ্রম
বিভাগের প্রতিবেদন অনুসারে শিশু শ্রম ব্যবহারের মাধ্যমে পণ্য উৎপাদনে বিশ্বে
বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। প্রথম স্থানে ভারত এবং তৃতীয় স্থানে রয়েছে ফিলিপাইন।
শিশু শ্রম নীতিমালা
শিশুঃ
বিভিন্ন দেশে আর্থসামাজিক অবস্থার ভিন্নতা, সাংস্কৃতিক ও মূল্যবোধের ভিন্নতা,
প্রকৃতি ও পরিবেশের ভিন্নতার কারণে দেশে দেশে শিশুর বয়স নির্ধারনে কিছুটা পার্থক্য
আছে । আবার একই দেশে কাজের ধরন ও কাজের পরিবেশের কারণে শিশুর বয়স নির্ধারণে
পার্থক্য রয়েছে। যেমন জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ(১৯৮৯) অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে সব
মানব সন্তানকে শিশু বলা হবে, যদিনা শিশুর জন্য প্রযোজ্য আইনের আওতায় ১৮ বছরের আগেও
শিশুকে সাবালক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আইএলও কনভেনশন ১৩৮ অনুযায়ী ১৫ বছরের নিচে
মানব সন্তানকে শিশু বলা হবে কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ১৮ বছরের নিচের বয়সের মানব
সন্তানকে শিশু বলা হবে। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী যাদের বয়স ১৪ বছর পূর্ণ
হয়নি তাদেরকে শিশু বলা হয়।
শিশু শ্রমিকঃ
প্রচলিত আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত বয়সের চেয়ে কম
বয়সে কাজে নিয়োজিত সকল শ্রমিকই শিশু শ্রমিক। বিশেষজ্ঞদের ঐক্যমত্য অনুযায়ী
প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক সকল ক্ষেত্রে শিশুর জন্য শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক
দিক থেকে ক্ষতিকর এবং শিশুর প্রয়োজন ও অধিকারের সঙ্গে সামজ্ঞস্যহীন বঞ্চনামূলক
শ্রমই শিশু শ্রম ।
(১) পোশাক শিল্প কারাখনা একটি শ্রম নিবিড়
শিল্প। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় লিড টাইম ব্যবস্থাপনার জন্য কারখানায় প্রচণ্ড কাজের চাপ
থাকে। ফলে এ শিল্পে শিশু শ্রমিক নিয়োগ শিশুর মানসিক বিকাশ সহায়ক হবে না বলে
কর্তৃপক্ষ মনে করেন যা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল শিশুর জন্য প্রযোজ্য।
(২) এ জন্য নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে
মানব সম্পদ বিভাগের অফিসারগণ চাকুরীর জন্য আগত প্রার্থীদের জাতীয় পরিচয় পত্র এবং
জন্ম নিবন্ধনের মাধ্যমে।
(৩) বাছাই এর পরও প্রার্থির বয়স নির্ধারনের
বিষয়টি অধিকতর নিশ্চিত হওয়ার জন্য রেজিস্টার্ড চিকিৎসক এর মাধ্যমে নিয়োগ প্রার্থীর
বয়স নির্ধারণ করা হয়।
(৪) কোন কোন ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ প্রার্থীর বয়স
প্রমাণের জন্য পরীক্ষা পাশের সনদ পত্র গ্রহণ করেন।
যদি কখনো অত্র প্রতিষ্ঠানে শিশু ও কিশোর শ্রমিক
আছে বলে প্রমানীত হয় তাহলে নিম্নে উল্লেখিত/শ্রম আইন অনুযায়ী সকল নিয়মনীতি
অনুসরনে কর্তৃপক্ষ অঙ্গীকার বদ্ধঃ-
(১) কোন কিশোর শ্রমিককে দিয়ে দৈনিক পাচঁ ঘন্টা
সপ্তাহে ত্রিশ ঘন্টার অধিক কাজ করানো যাবে না।
(২) কোন কিশোর শ্রমিককে দিয়ে দৈনিক অতিরিক্ত
দুই ঘন্টা সহ মোট ৭ ঘন্টা সপ্তাহে বিয়ালি¬শ ঘন্টার বেশী কাজ করানো যাবে না।
(৩) কোন কিশোর শ্রমিককে দিয়ে সন্ধ্যা ৭:০০
ঘটিকা থেকে সকাল ৭:০০ঘটিকার মধ্যে কোন কাজ করানো যাবে না।
(৪) কিশোর শ্রমিকের কাজের সময় দুইটি পালায়
সীমাবদ্ধ রাখিতে হইবে, এবং কোন পালার সময় সীমা সাড়ে সাত ঘন্টার বেশী হবে।
(৫) কোন কিশোর শ্রমিক একই দিনে একাধিক
প্রতিষ্ঠানে কাজ করিতে পারিবে না।
(৬) কোন কিশোর শ্রমিককে দিয়ে ভূগর্ভে অথবা পানির
নীচে কাজ করানো যাবেনা।
(৭) বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতি কিশোর কর্ম
ঘন্টা সর্ম্পকে তাহার কাজের নিদির্ষ্ঠ সময় উল্লেখ পূর্বক একটি নোটিশ প্রদর্শন
করিতে হইবে।
(৮) বিধিতে যাহা কিছুই থাকুক না কেন তাহাদের
স্বাস্থ্য উন্নতি এবং শিক্ষা গ্রহনে বাধা এমন কোন কাজ দেয়া যাবে না।
(৯) যদি কোন কিশোর শ্রমিক বিদ্যালয়গামী হয় তাহা
হইলে তাহার কাজের সময় এমনভাবে নির্ধারন করিতে হইবে যাহাতে তাহার বিদ্যালয় গমনে
বিঘিœত না হয়।
(১০) কিশোর শ্রমিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এই
অধ্যায়ের সকল বিধান যতদুর সম্ভব, উক্ত শিশু শ্রমিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হইবে।
শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। জাতিকে
সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে শিশুদের উন্নয়নের সার্বিক কার্যক্রম অগ্রাধিকার
ভিত্তিতে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন। বাংলাদেশ জাতীয় শিশু নীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল
হয়ে কর্তৃপক্ষ সকল সময়েই শিশু শ্রমিক নিয়োগ নিরুৎসাহিত করে।
শিশু শ্রমের অপকারিতা:
শিশু শ্রমিক দ্বারা ভারি কাজ করালে শিশুরা
পঙ্গুুত্ব বরণ করতে পারে
বেশি ঝুকিপূর্ণ বা বিপজ্জনক কাজে শিশুর মানষিক
বিকৃতি দেখা দিতে পারে
শিশুদের পারিশ্রমিক কম থাকায় কাজের প্রতি
অমনোযোগী হয়
বর্হিবিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করে
মানের বেতন এবং উচ্চমানের কাজ হওয়ায় কাজের
গুনগন মান বজায় থাকে না
বাংলাদেশে শিশু শ্রম : আইন ও প্রতিকার
জাতিসংঘ প্রণীত শিশু অধিকার সনদে ১৮ বছরের কমবয়সী প্রত্যেককে শিশু
বলা হয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন আইনে ১৫ বছরের কমবয়সী প্রত্যেককে শিশু হিসেবে চিহ্নিত
করা হয়েছে। তাই ১৪ বছরের মধ্যে সকলেই এ দেশের শিশু। জাতিসংঘের শিশুসনদ এখন একটি আন্তর্জাতিক
আইন। এতে বলা হযেছে, শিশুর বেঁচে থাকা তাদের জন্মগত অধিকার। এরই সাথে শিশুর জন্য নিচের
অধিকারগুলির কথাও মনে রাখতে হবে সচেতন সমাজের ও আপামর জনতার। স্নেহ, ভালবাসা ও সমবেদনা
পাওয়ার অধিকার। পুষ্টিকর খাদ্য ও চিকিৎসা সুবিধা পাওয়ার অধিকার। অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ।
খেলাধুলা ও আমোদ- প্রমোদের পূর্ণ সুযোগ পাওয়ার অধিকার। একটি নাম ও নাগরিকত্ব। দুর্যোগের
সময় সবার আগে ত্রাণ পাওয়ার অধিকার। সমাজের কাজে লাগার উপযোগী হয়ে গড়ে উঠার এবং ব্যক্তিসামর্থ
অর্থাৎ সুপ্তপ্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাওয়ার অধিকার। শান্তি ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের মনোভাব
নিয়ে গড়ে ওঠার অধিকার। এ সব অধিকার জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে
বিশ্বের সব শিশুর থাকবে। বাংলাদেশে শিশুদের অধিকার রক্ষা ও তাদের বিকাশের জন্য রয়েছে
নানা আইন। কিন্তু তারপরেও বাংলাদেশে লঙ্ঘিত হচ্ছে শিশু অধিকার। সমাজ থেকে শিশু-কিশোরদের
যেসব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার কথা তা পদে পদে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শিশুনীতিকে পাশ কাটিয়েই
শিশুদের ভারী গৃহশ্রমসহ বেআইনি কাজে যুক্ত করা হচ্ছে এবং ভিন্ন পথায়নে পিছু পা হাঁটছেন
অবুঝ শিশুরা। দেশে ১৪ বছরের কমবয়সীদের গৃহশ্রমে নিযুক্ত না করায় হাইকোর্টের রায় ঘোষণার
পরও তা কার্যকর হচ্ছে না। বাংলাদেশে গৃহকর্মে নিয়োজিতদের সিংহভাগই কিশোর-কিশোরী ও শিশু।
জাতীয় শিশুনীতি-২০১০ এর খসড়ায় বলা হয়েছে, ১৪ বছরের কম বয়সীদের সার্বক্ষণিক শিশুশ্রমে
নিয়োগ করা যাবে না, কিন্তু বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে প্রায় ৩০০ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনৈতিক
কাজে শিশুরা শ্রম দিচ্ছে। দেশের প্রচলিত আইনে শিল্প কারখানায় শিশু শ্রম নিষিদ্ধ হলেও
জীবিকার প্রয়াজনে শৈশব অবস্থায় অনেক শিশুকে নানা ধরনের শ্রমে নিয়োজিত হতে হচ্ছে। শহর,
গ্রাম উভয় অঞ্চলেই শিশু শ্রমিক নিয়োগ করা হয়। সরকারের পরিসংখ্যান বিভাগের হিসেব মতে
দেশের মোট শ্রমিকের ১২% শিশু শ্রমিক; এ হিসেবে কেবল মাত্র নিবন্ধনকৃত শিল্প প্রতিষ্ঠানে
কর্মরত শিশু শ্রমিকদের ধরা হয়েছে। অনিবন্ধনকৃত বা ননফরমাল সেক্টরে কর্মরত শিশু শ্রমিকদের
হিসেব করলে এ সংখ্যা আরো বাড়বে।
শুধু শহরাঞ্চলেই চরম দারিদ্র্য ও বঞ্চনার মাঝে ১৫ বছরের কমবয়সী
যে সকল শিশু শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে তাদের সংখ্যা ১৯৯০ সালে প্রায় ২৯ লক্ষ বলে এক সমীক্ষায়
উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও অতিবাস্তবতা হল নুন আনতে যাদের পান্তা ফুরায় তাদের ঘরে সন্তান
এলে সে শিশুটি হয় অবহেলিত, নিগৃহীত ও অধিকারবঞ্চিত। পরিবারের মধ্যেই সে শিশু পরগাছার
মত বেড়ে ওঠে। দারিদ্র্যের কারণেই শিশুরা একটি কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়ায়। অতি অল্পবয়সে
ভারী শ্রমের পথ বেছে নিয়ে মেনে নেয় সম্ভাব্য পঙ্গুত্বকে। নানা প্রতিবন্ধকতার সাথে যুদ্ধ
করে বেড়ে ওঠে অধিকারবঞ্চিত শিশুরা।
শিশুরা অনেক ক্ষেত্রে বয়স্ক শ্রমিকের কাজ করে প্রাপ্য মজুরি থেকে
বঞ্চিত হয়। অদক্ষ শ্রমের দোহাই দিয়ে শিশুটিকে অধিক খাটিয়েও ন্যায্য পারিশ্রমিক দেয়া
হয় না। শিশু শ্রমিকরা আইনের পথ চেনে না। ওরা নীরবে বেঁচে থাকার তাগিদে মুখ বুজে কাজ
করে। পেটের জ্বালায় শিশুরা মালিক আর মনিবের অবাধ নির্যাতন ও দুর্ব্যবহার, অবহেলা সহ্য
করেও স্বল্প আয়ে কাজ করে কোমলমতি শিশুরা। আবার কোন শিশু জড়িয়ে পড়ে নানা রকম সমাজবিরোধী
কাজের সাথে।
অথচ শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ জনশক্তি, আজকের শিশু আগামী দিনের নাগরিক
এবং দেশের কর্ণধার। শিশুই আমাদের আশা ভরসা। শিশুঅধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বপ্রথম দেশ
থেকে দারিদ্র্য দূর করতে হবে। দূর করতে হবে নানা কুসংস্কার। যে শিশু আগামীর নাগরিক,
সে শিশুর জীবন যদি অরক্ষিত হয়ে যায় তবে আমাদের গোটা সমাজই বিপন্ন হয়ে পড়বে। অতীত যেমন
আমাদের মাঝে বেঁচে আছে। আমরাও বেঁচে থাকবো ভবিষ্যতের মাঝে। হয়তো ঠিক আমরা নই-আমাদের
কীর্তি আর আমাদের স্বপ্ন। শিশুদের হাতেই জাতির উন্নয়ন সম্ভাবনার চাবিকাঠি তাই শিশুদেরকে
গড়ে তুলতে হবে আমাদেরই। শিশুরা জাতির সেরা সম্পদ। আজ যারা শিশু, আগামীকাল হবে তারাই
দেশ গড়ার সৈনিক। শিশুকে তার প্রাপ্য পূর্ণ অধিকার দিয়ে গড়ে তুলতে পারলেই সার্থক হবে
বাংলাদেশ। কলঙ্কমুক্ত হবে আমাদের সমাজ ও সামাজিক বৈষম্য।

